অক্সিজেনের অভাবে রোগীর মৃত্যুকে ঘিরে নওগাঁয় ভুক্তভোগী ও সেবিকাদের পাল্টাপাল্টি মানববন্ধন
নওগাঁ প্রতিনিধি
নওগাঁ জেনারেল হাসপাতালে অক্সিজেনের অভাবে রোগীর মৃত্যুকে ঘিরে ভুক্তভোগী অভিভাবক ও সচতেন মহলের পক্ষ থেকে বিক্ষোভ মানবন্ধন কর্মসূচি পালন করা হয়েছে। এদিকে একই ঘটনায় ডিউটিরত নার্সিং কর্মকর্তাদের হেনস্থা, প্রাণ নাশের হুমকি এবং ইন্টার্ন নার্সদের শারিরীকভাবে নির্যাতনের বিচারের দাবিতে মানববন্ধন করেছে।
রবিবার বেলা সাড়ে ১১ টার দিকে শহরের মুক্তির মোড়ে রোগীর মৃত্যুর অভিযোগ তোলে ‘নওগাঁ নাগরিক অধিকার সংগ্রাম পরিষদের’ ব্যানারে বিক্ষোভ সমাবেশ হয়। অপরদিকে একই সময় চিকিৎসা সেবায় নিয়োজিত সেবিকাদের লাঞ্ছিত গালিগালাজ ও হত্যার হুমকির প্রতিবাদে নওগাঁ ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের সামনে নার্সিং কর্মকর্তা, ইন্টার্ন নার্স ও ছাত্র-ছাত্রীর ব্যানের ঘন্টাব্যাপি কর্মসূচী পালন করে।
শহরের মুক্তির মোড়ে অনুষ্ঠিত প্রতিবাদ সমাবেশে ঙ বক্তরা বলেন,গত শুক্রবার (১৭ এপ্রিল) আমাদের সহযোদ্ধা সুজন কুমার মন্ডলের মাকে হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়। ভালো চিকিৎসা পাওয়ার আশায় তাকে হাসপাতালের সবচেয়ে ভালো কেবিনে ভর্তি করানো হয়। ভর্তির পরে তারা আমাদেরকে বলে রোগীকে রক্ত দিতে হবে। সন্ধ্যার আগে আগে রোগীর শ্বাসকষ্ট শুরু হয়। তখন নার্সদেরকে ডেকে আনলে কেবিনে যে অক্সিজেন লাইন রয়েছে এই অক্সিজেন মাস্ক তারা রুগীকে পরিয়ে দেয়। অক্সিজেন মাস্ক লাগানোর ১৫-২০ মিনিট পেরিয়ে গেলেও রুগীর অস্থিরতা কাটে না। তখন রোগীর লোকজন মাস্ক খুলে দেখে সেটিতে কোন অক্সিজেন আসছে না। বিষয়টি নার্সদেরকে জানানোর পরেও তারা গল্প গুজবে মেতে থাকে। এক পর্যায়ে ৪০-৪৫ মিনিট ছটফট করার পরে রোগীর মৃত্যু হয়। এটি একটি পরিকল্পিত ভাবে হত্যা। কারণ নার্সরা জানতো ওই লাইনে অক্সিজেন আসেনা। আমরা এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং বিচার চাই।
সমাবেশে বক্তারা দাবি জানিয়ে বলেন, অক্সিজেন সংকটের নামে রুগী হত্যার সুষ্ঠু তদন্ত করতে হবে। দায়িত্বে অবহেলাকারী এবং দুর্ব্যবহারকারী নার্স ও হাসপাতাল স্টাফদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। হাসপাতালে বহিরাগত প্রভাব ও দালাল চক্র নির্মূলে ব্যবস্থা নিতে হবে। হাসপাতালকে দুর্নীতিমুক্ত ও সুচিকিৎসার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
প্রতিবাদ সমাবেশ এনসিপির জেলা কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক দেওয়ান মাহবুব আল হাসান সোহাগ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস জেলা শাখার সেক্রেটারি মুফতি ইসরাফিল আলম,উপদেষ্টা খন্দকার রেজাউর রহমান টুকু, বাসদের জেলা কমিটির আহ্বায়ক জয়নাল আবেদীন মুকুল, ভাসানী পরিষদ নওগাঁর আহ্বায়ক জাহিদ রাব্বানী রশিদসহ অন্যরা বক্তব্য রাখেন।
এদিকে একই ঘটনায় ডিউটিরত নার্সিং কর্মকর্তাদের হেনস্থা ও প্রাণ নাশের হুমকি এবং ইন্টার্ন নার্সদের উপর শারিরীকভাবে নির্যাতনের বিচার দাবিতে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়েছে।
মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, আমাদের সিনিয়র স্টাফ নার্স এবং ইন্টার্ন নার্সরা ডিউটিরত অবস্থায় ছিলেন। রোগীর যা যা চিকিৎসার প্রয়োজন সকল চিকিৎসায় দেওয়ার পরেও রুগীর অবস্থা খারাপ হয় এবং রোগী মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। এই ইস্যুকে কেন্দ্র করে এনসিপির নাম ভাঙ্গিয়ে মাহবুব হাসান সোহাগ নামে একজন আমাদের উপর হামলা করেন এবং অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করেন। আমাদের একজন ইন্টার্ণ নার্সের গায়ে সে হাত তুলে এবং তাকে মারধর করে। আমাদের মেয়ে নার্সদেরকেও মারধর করার জন্য এগিয়ে আসে। বহিরাগত ছেলেপেলে এনে হাসপাতালে সে মব সৃষ্টি করে আমাদেরকে অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে ফেলে। আমরা আমাদের নিরাপত্তা ঝুঁকিতে রয়েছি। আমরা অবিলম্বে এ ঘটনায় সোহাগের বিচার চাই।
নওগাঁ ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের ইন্টার্ণ নার্স ইয়ামিন হাসান বলেন, মাগরিবের নামাজ পড়ে উপরে এসে দেখি কেবিনে অনেক হৈচৈ হচ্ছে। সোহাগ নামে একজন এনসিপির প্রভাবশালি নেতা আমাদের সিনিয়র নার্সদের অকথ্য ভাষায় বকাঝকা করছিলেন। এ সময় আমি সেখানে যেয়ে উপস্থিত হই৷ তখন তিনি আমাকে হাত ধরে ৮০৮ নম্বর কেবিনে নিয়ে যান। সেখানে নিয়ে যেয়ে আমাকে শারিরীক এবং মানসিকভাবে নির্যাতন করেন। আমি এই ঘটনার সুষ্ঠু বিচার চাই।
সিনিয়র স্ট্যাফ নার্স শবনম মুস্তারি বলেন, আমাদের সেবার স্থানের সুস্থ একটা পরিবেশ চাই। নিরাপত্তার সাথে আমরা ডিউটি পালন করতে চাই। কেউ আমাদের এসে মারধর করবে, অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করবে এভাবে তো আমরা সেবা দিতে পারবো না। এই ঘটনার দ্রুত সময়ের মধ্যে বিচার নাহলে আমরা কর্মবিরতিতে যেতে বাধ্য হবো৷
নওগাঁ ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের ইন্টার্ন চিকিৎসক ডা. বারিউল হায়দার বলেন, যে রোগীটি ভর্তি ছিলো তার সিভিয়ার এ্যানিমিয়া ছিলো। রক্ত স্বল্পতা ছিলো সেই সঙ্গে অনেকে ডিজিস ছিলো। প্যাশেন্ট দুপুরে ভর্তি হয়েছে এরপর থেকে উনার যা যা চিকিৎসা প্রয়োজন সবকিছুই দেওয়া হয়েছে। রোগীর লোকজন যে অভিযোগ করতেছে অক্সিজেনের অভাবে রোগী মারা গেছে এটি উনাদের সম্পূর্ণ ধারণা থেকে বলছেন৷ আমরা আমাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি। তাদের রোগীর মৃত্যু নিয়ে কোন অভিযোগ থাকলে সেটি তাদের জানানোর অধিকার আছে। কিন্তু হাসপাতালে কাউকে মারধর করে আইন হাতে তুলে নেওয়ার অধিকার কারও নেই। আমরা আমাদের কর্মস্থলের নিরাপত্তা চাই।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) নওগাঁ জেলা শাখার যুগ্ম আহ্বায়ক দেওয়ান মাহবুব আল হাসান সোহাগ বলেন, সহযোদ্ধা সুজন কুমার মন্ডলের মায়ের মৃত্যুর খবর শুনে দ্রুত সময়ের মধ্যে হাসপাতালে যাই। সেখানে যাওয়ার পরে একটি ইসিজি করাই। ইসিজিতে মিনিমাম হার্টবিটের একটি অস্তিত্ব পাই। সেখানে একজন পুরুষ নার্স ছিলো আমি তখন তাকে বলি ভাই আপনি দ্রুত সময়ের মধ্যে ইমারজেন্সি ডক্টরকে ডেকে নিয়ে আসেন। সে তখন আমাকে বলে আমার ডিউটি ৮তলায় আমি নিচতলায় যাবোনা, পারলে আপনারা যান। তখন আমি ওই নার্সকে চড় মারি৷ চড় খাওয়ার পরে সে ইমারজেন্সি ডক্টরকে ডেকে নিয়ে আসে। জাতির কাছে আমার প্রশ্ন ইমারজেন্সি ডাক্তারকে দিকে আনা রুগীর লোকজনের দায়িত্ব? নাকি নার্সদের দায়িত্ব। ইমারজেন্সি ডক্টর রোগীকে দেখার পরে মৃত্যু ঘোষণা করে৷ ইমারজেন্সি ডক্টর এসে তাদেরকে বকাবকি করে। রুগীর এই অবস্থা তোমরা আমাকে কেনো ডাকলা না। তারা এর কোন জবাব দিতে পারেনা। এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত নার্সদের অপসারণ এবং তাদের বিচারের দাবি জানাই।
২৫০ শয্যা নওগাঁ জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা.আ ম আখতারুজ্জামান বলেন, ঘটনার সময় আমি ছুটিতে ছিলাম তাই এখন এ বিষয়ে কিছু বলতে পারছি না। এ ঘটনায় ৫ সদস্য বিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত রিপোর্ট পেলে ঘটনার সঠিক কারণ বলা যাবে। তদন্তে কারো বিরুদ্ধে গাফিলতীর প্রমাণ মিলে অবশ্যই তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।