| প্রচ্ছদ

মতভেদ হলেই বসিয়ে দিচ্ছে অন্যের শরীরে

বগুড়ায় তরুণদের মধ্যে পকেটে চাকু-ছুরি রাখার প্রবণতা বেড়েছে

স্টাফ রিপোর্টার
পঠিত হয়েছে বার। প্রকাশ: ২০ মে ২০২১ ১৩:১১:৪০ ।

বগুড়ায় তরুণদের মাঝে পকেটে চাকু বা ছুরি নিয়ে চলাফেরা করার ভয়ঙ্কর এক প্রবণতা গড়ে উঠেছে। এরা এতটাই বেপরোয়া হয়ে উঠেছে যে, পাড়া-মহল্লায় আড্ডা এবং খেলাসহ ধর্মীয় উৎসবের দিনসহ যে কোন আয়োজন নিয়ে কারও সঙ্গে মতভেদ কিংবা স্বার্থ হাসিলে যাকেই বাধা মনে করছে তাকেই এলোপাথারী চাকু বা ছুরি বসিয়ে দিচ্ছে। তবে এর বাইরেও মাদকের টাকা না দেওয়া  এবং ছিনতাইয়ে বাধা হয়ে দাঁড়ানোর ক্ষেত্রেও ছুরিকাঘাতের ঘটনা ঘটছে।
গত ৬ মার্চ থেকে ১৬ মে পর্যন্ত ৭১ দিনে বগুড়ায় ছুরিকাঘাতের অর্ধশত ঘটনা  ঘটলেও মাত্র ১৫টি’র খবর গণমাধ্যমে এসেছে। এর মধ্যে ঈদের দিন এবং তার পরদিন অন্তত ৪টি ছুরিকাঘাতের ঘটনাও রয়েছে। ওই সময়ের মধ্যে ৩জন নিহত এবং পুলিশের এস সাব ইন্সপেক্টরসহ ১৭জন আহত হয়েছেন। পুলিশী তদন্তে দেখা গেছে ছুরিকাঘাতের ঘটনায় সম্পৃক্তদের অধিকাংশেরই বয়স ২২ বছর থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে। তবে প্রতিটি ক্ষেত্রেই দেখা গেছে তাদের সবার পকেটে চাকু কিংবা ছুরি ছিল। মাঠ পর্যায়ের একাধিক পুলিশ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সড়ক-মহাসড়ক এবং পাড়া-মহল্লায় মোটর সাইকেল আরোহীদের তল্লাশীর সময় ৮০ ভাগ তরুণের পকেটে চাকু বা ছুরি পাওয়া যায়।
তরুণদের এমন আচরণে সচেতন মহল বিশেষত অভিভাবকরা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন। তাদের কেউ কেউ এজন্য মাদকের প্রতি আসক্তি এবং সামাজিক অবক্ষয়কে দায়ী করে এ ব্যাপারে প্রতিটি পরিবারকে তাদের সন্তানদের প্রতি যত্নবান হওয়ার পাশাপাশি আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের নজরদারি বাড়ানোর কথা বলেছেন। অবশ্য পুলিশ কর্মকর্তারা মনে করেন, শুধু আইন প্রয়োগ করে এ সমস্যার সমাধান হবে না। তরুণরা যাতে বিপথে না যায় সেজন্য তাদের পিতা-মাতা, অভিবাবক এবং মহল্লা ভিত্তিক জনপ্রতিনিধিসহ প্রত্যেককে তার অবস্থান থেকে কাজ করে যেতে হবে।
পুলিশের রেকর্ড অনুযায়ী শুধু গল্প আর আড্ডায় নয় ওয়াজ মাহফিলের মত ধর্মীয় অনুষ্ঠানেও ছুরিকাঘাতের ঘটনা ঘটছে। গত ৬ মার্চ জেলার শেরপুর উপজেলায় ওয়াজমাহফিল শুনতে যাওয়া  সজীব হোসেন (১৬) নামে স্থানীয় ডিজে হাইস্কুলের এক ছাত্রকে তার সহপাঠীরা ছুরিকাঘাত করে। আবার ক্রিকেট খেলা নিয়ে বিরোধে ঈদের দিন দুপুরে বগুড়া শহরতলীর কৈচড় গ্রামে শিহাব (২৫) ও মেহেদী (২৩) নামে দুই তরুণ ছুরিকাহত হয়েছেন। কৈচড় বাজারের ব্যবসায়ী সেতু জানান, টাকার বিনিময়ে খেলা নিয়ে বিরোধের জেরে অন্য এলাকার সমবয়সীরা পকেটে থাকা চাকু দিয়ে ওই দু’জনকে জখম করে। এর পরদিন ক্রিকেট খেলা নিয়ে বিরোধে ধুনটের গোসাইবাড়ি এলাকায় কলেজ ছাত্র জাকির হোসেন স্বাধীনকে (২২) ছুরিকাঘাত করা হয়। ওই ঘটনায় অভিযুক্ত ২২ বছরের তরুণ আজও ধরা ছোঁয়ার বাইরে। স্থানীয়দের অভিযোগ,  অভিযুক্ত সেই তরুণ আরও একাধিক ব্যক্তিকে ছুরিকাঘাত করেছে। এছাড়া ‘ফ্রি-ফায়ার’ গেম নিয়ে বিরোধে গত ৫ মে  শাজাহানপুর উপজেলার চোপীনগর গ্রামে সমবয়সীদের হাতে সজীব আহমেদ (২০), রায়হান হোসেন (২২) ও মুজাহিদ হোসেন (২০) ছুরিকাহত হন। 
ঈদের দিন রাতে বাড়ির পাশে শপিংমলের সামনে বসে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দেওয়ার সময় বগুড়া শহরের সার্কিট হাউস রোডে বখাটেদের হাতে ছুরিকাহত হন বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া আব্দুল্লাহ আল নোমান (২৩)। বর্তমানে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন নোমানের বাবা আইনজীবী তবিবর রহমান অভিযোগ করেন, তার ছেলের সমবয়সী এক বখাটে মোবাইল ফোনে কোন এক মেয়েকে উত্যক্ত করছিল। তিনি বলেন, ‘এটা দেখার পর আমার ছেলে তার প্রতিবাদ করে। এরপর ওই বখাটেসহ আরও কয়েকজন সহযোগী আমার ছেলের বুকের বাম পাশে এলোপাথারি ছুুিরকাঘাত করে।’ বখাটেদের পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ’তারা সব সময় পকেটে চাকু নিয়ে ঘোরাফেরা করে। ছেলে সুস্থ হয়ে বগুড়া ফেরার পর আমি মামলা করবো।’
ঈদের পরদিন সন্ধ্যায় বগুড়া শহরের নারুলী এলাকায় ইভটিজিংয়ের প্রতিবাদ করায় সমবয়সী বখাটেদের ছুরিকাঘাতে নবীন হোসেন রকি (২২) নামে এক তরুণ ছুরিকাহত হন। তার পরদিন ১৬ মে রাতে শহরের মালগ্রাম এলাকায় একটি মেসে বসে তাস খেলার সময় রনি (৩২) নামে এক তরুণকে ছুরিকাঘাত করা হয়। গুরুতর আহত রনিকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। ওই ঘটনায় জড়িতদের পুলিশ এখনও সনাক্ত কিংবা গ্রেফতর করতে পারেনি।
বগুড়ায় সাম্প্রতিকালে ছুরিকাঘাতে যেসব হত্যাকাণ্ড ঘটেছে তার মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত সরকারি আজিজুল হক কলেজ ক্যাম্পাসে সংঘটিত বিশু মিয়ার (২৬) খুনের ঘটনাটি। সরকারি আজিজুল হক কলেজ থেকে হিসাব বিজ্ঞানে মাস্টার্স করা মিশু মিয়াকে গত ৪ এপ্রিল রাতে কারা খুন করেছে সেটা এখনও জানতে পারেনি পুলিশ। তবে ক্যাম্পাস সংলগ্ন মেসে বসবাসকারী একাধিক শিক্ষার্থী জানিয়েছেন, সন্ধ্যা নামলেই ক্যাম্পাসে সক্রিয় হয়ে ওঠা তরুণ মাদক সেবীরাই ছিনতাইয়ে বাধা দেওয়ায় বিশুকে খুন করেছে। এর দু’দিন আগে ওই ক্যাম্পাসেই রাতে হাঁটতে গিয়ে ছুরিকাহত হন পুলিশের সাব ইন্সপেক্টর রবিউল ইসলাম। 
গত ১৪ এপ্রিল রাতে শহরের মাটিডালী এলাকায় ছুরিকাঘাতে নিহত শফিউল্লাহ পিপলুর (৩৫) খুনীরাও অধরা রয়ে গেছেন। তবে ঈদের দু’দিন আগে ১২ মে বগুড়া সদর উপজেলার শেখেরকোলা ইউনিয়নের বালাকৈগাড়ি গ্রামে নানি আছিয়া বেওয়াকে ছুরি দিয়ে হত্যার অভিযোগে নাতি ইয়াকুব আলীকে (১৯) পুলিশ দ্রুত গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়েছে। গ্রেফতারের পর ইয়াকুব আলী পুলিশকে জানিয়েছে, মাদক কেনার টাকা না দেওয়ায় সে তার নানীকে হত্যা করেছে।
বগুড়ার বিশিষ্ট কথা সাহিত্যিক বজলুল করিম বাহার জানিয়েছেন, সাম্প্রতিকালে এ জেলায় ছুরিকাঘাতের ঘটনা বেড়েছে। ইদানিং তরুণ এমনকি অনেক কিশোরদেরকে পকেটে চাকু বা ছুরি নিয়ে ঘুরতে দেখা যাচ্ছে। এজন্য তিনি সামাজিক অবক্ষয়কে দায়ী করে বলেন, ‘যারা চাকু বা ছুরি নিয়ে চলাফেরা করে তাদের অধিকাংশই আবার মাদকসেবী বলে পরবর্তীতে জানতে পারছি। তাদের কেউ কেউ আবার পরিবার থেকেও বিচ্ছিন্ন। আমরা যদি নিরাপদ সমাজ গড়ে তুলতে চাই তাহলে প্রত্যেক বাবা-মাকে তার সন্তাদের প্রতি যত্নবান হতে হবে। যাতে তারা বিপথে না যায়। পাশাপাশি আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদেরও নজরদাড়ি বাড়াতে হবে।’
বগুড়ায় পুলিশের মিডিয়া বিভাগের প্রধান অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ফয়সাল মাহমুদ জানান, বগুড়ায় চাকু ও ছুরির ব্যবহারের প্রবণতা বেশি। বিশেষত তরুণদের মধ্যে এটা বেশি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। তবে তাদের প্রতিরোধে পুলিশ নানাভাবে কাজ করে যাচ্ছে। প্রতিদিন সন্ধ্যার পর পাড়া-মহল্লায় অভিযান চালানো হচ্ছে। অযথা কেউ বাইরে থাকলে তাদের বাড়ি পঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে। তাছাড়া সন্দেহজনক আচরণকারী তরুণদের থানায় এনে অভিভাবকদের ডেকে তাদের জিম্মায় দেওয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘আমরা আমাদের কাজ করে যাচ্ছি। এর পাশাপাশি অভিভাবক এবং সমাজের বিশিষ্টজনদেরও দায়িত্ব আছে। নিজ পাড়ার তরুণ ছেলেরা যাতে বিপথে না যায় সেজন্য তাদেরও সজাগ ও সতর্ক হতে থাকতে হবে।’

মন্তব্য